
রাজনীতি শুধু ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ত্যাগ, সাহস, আদর্শ ও দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফল। যে রাজনীতিক দুঃসময়ে দলের পাশে দাঁড়ায়, মামলা-হামলার ভয় উপেক্ষা করে মাঠে থাকে, পরিবার-পরিজনের স্বাভাবিক জীবন বিসর্জন দেয়, তাদের মূল্যায়ন করা শুধু নৈতিক দায় নয়, সাংগঠনিক প্রয়োজনও বটে। সেই বিবেচনায় জিনাতুন নেছা জিনু প্রকাশ জিনিয়া আজ মহিলা কোটায় সংসদ সদস্য হওয়ার দাবিদার, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও নেতাকর্মীরা।
জিনিয়া বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি পাঁচলাইশ থানা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেত্রীর রাজনৈতিক পথচলা কোনো আরামদায়ক পথ ছিল না; বরং ছিল চ্যালেঞ্জ, প্রতিকূলতা এবং নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে পরিপূর্ণ। দলের কঠিন সময়ে যখন অনেকেই মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে গেছেন, তখন জিনিয়া মাঠে ছিলেন সরব, দৃঢ় এবং আপসহীন।
সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন, ঢাকা সুপ্রিম কোর্ট খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় দেড় বছরের বেশী সময় কারাগারে ছিলেন। ৮টি মামলার সবগুলোতে জামিনে থাকলেও হাজিরা দিতে প্রতি মাসে ঢাকায় যেতে হয়। এছাড়া ঢাকা চট্টগ্রামসহ সারাদেশের রাজবন্দীদের মুক্তি ও স্বৈরাচার পতনে দলের আন্দোলন, সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজপথের কর্মসূচি, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন কিংবা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ, সবখানেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন সাহসিকতার সঙ্গে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ এখনো নানা বাধার মুখোমুখি হয়; সেই বাস্তবতায় একজন নারী নেত্রী হিসেবে তার ধারাবাহিক সক্রিয়তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি পুরুষতান্ত্রিক কোনো একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়; বরং আদর্শ ও সাহস থাকলে নারীও নেতৃত্বের প্রথম সারিতে থাকতে পারেন।
জিনিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু মিটিং-মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আত্মত্যাগেরও গল্প। একাধিক মামলার আসামি হওয়ার ঝুঁকি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি, সামাজিক চাপ, এসব সত্ত্বেও তিনি পিছু হটেননি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কিংবা পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য না দিয়ে তিনি দল ও আদর্শকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। পরিবারকে ঠিকভাবে সময় দিতে না পারা, সন্তান-স্বজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত হওয়া, এসব ত্যাগ কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, কিন্তু রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে এর মূল্য অপরিসীম।
রাজনীতি ও জনসেবা তার কাছে পেশা নয়, এক ধরনের নেশা, আদর্শের প্রতি গভীর অঙ্গীকার। এই নেশাই তাকে প্রতিকূলতার মাঝেও অনুপ্রাণিত করেছে। জনসাধারণের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, এই তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি কাজ করে গেছেন। চট্টগ্রাম মহানগরে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সক্রিয় রাখতে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, বিভক্তি নিরসনে উদ্যোগ, এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে উৎসাহ প্রদান, এসব ক্ষেত্রেও তার অবদান প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশের সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মহিলা কোটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা। তবে এই কোটায় মনোনয়ন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হওয়া উচিত নয়; বরং তা হওয়া উচিত সংগ্রামী, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেত্রীদের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি উপায়। জিনিয়ার মতো নেত্রীদের সংসদে যাওয়ার সুযোগ দিলে তা হবে রাজনীতির সুষ্ঠু ধারাকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ। কারণ তিনি মাঠের রাজনীতি জানেন, তৃণমূলের চাহিদা বোঝেন এবং দলের কঠিন সময়ে প্রমাণ করেছেন তার সাহস ও নেতৃত্বের যোগ্যতা।
মহিলা কোটায় সংসদ সদস্য হিসেবে জিনিয়ার অন্তর্ভুক্তি শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতি হবে না; এটি হবে দুঃসময়ের কর্মীদের জন্য একটি বার্তা, ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না। এতে নারী কর্মীদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রূপ পাবে। একই সঙ্গে দলীয় রাজনীতিতে আনুগত্য, ধারাবাহিকতা ও আদর্শিক অবস্থানের মূল্যায়নের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।
সংসদে তার উপস্থিতি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তৃণমূলের অভিজ্ঞতা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করবে। দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করার ফলে তিনি জানেন সংগঠন কীভাবে গড়ে ওঠে, কীভাবে ভাঙে, এবং কীভাবে পুনর্গঠিত হয়। এই অভিজ্ঞতা আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নারী অধিকার, রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-হামলার শিকার নেতাকর্মীদের সুরক্ষা এবং তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মীদের মর্যাদা রক্ষার মতো বিষয়গুলোতে তিনি কার্যকর কণ্ঠ হতে পারেন।
আজ যখন রাজনীতিতে আদর্শিক স্থিতি ও ত্যাগের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন জিনিয়ার মতো নেত্রীদের সামনে আনা জরুরি। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিকূল সময়ই প্রকৃত নেতৃত্বকে চিহ্নিত করে। মামলার ভয়, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা কিংবা সামাজিক চাপ, কিছুই তাকে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে সরাতে পারেনি। তার এই দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে মহিলা কোটায় সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হলে তা হবে ন্যায়সঙ্গত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
সবশেষে বলা যায়, রাজনীতিতে যারা দুঃসময়ে অবিচল থাকেন, তারাই সুসময়ের দাবিদার। জিনাতুন নেছা জিনু প্রকাশ জিনিয়া সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন নেত্রী। তার ত্যাগ, শ্রম ও আদর্শিক অঙ্গীকার বিবেচনায় তাকে মহিলা কোটায় এমপি হিসেবে সংসদে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত, এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই স্বীকৃতি শুধু একজন নেত্রীর প্রাপ্য সম্মান নয়; এটি হবে ত্যাগী রাজনীতির প্রতি সম্মান এবং সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
উল্লেখ্য জিনিয়া রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কর্মকান্ডেও নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন। সার্ক মানবাধিকার এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া উইম্যান এমপাওয়ারমেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি, উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ কম্বাইন্ড প্রফেশনাল কাউন্সিল, চট্টগ্রাম, উইম্যান ডিস্ট্রিক স্পোর্টস অরগানাইজেশন, চট্টগ্রাম ও রোটারি ক্লাব চট্টগ্রামের সদস্য হিসেবে সমাজ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রখেছেন।










