
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং টেকসই পরিবহন নিশ্চিত করতে রেলওয়ের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো, কম খরচে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেলব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ, সৎ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। এমন নেতৃত্বই একটি প্রতিষ্ঠানের গতি বদলে দিতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দোহাজারী- কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্বে তাঁর প্রকৌশলগত দক্ষতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে একজন অভিজ্ঞ রেল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত করেছে।
রেলওয়ের উন্নয়ন কেবল নতুন রেললাইন নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, সময়ানুবর্তিতা, সেবার মান বৃদ্ধি এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার। একজন দক্ষ প্রশাসক এসব বিষয়কে সমন্বয় করেই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। সুবক্তগীনের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সহকর্মীদের অনেকের মতে, তিনি নিয়ম-শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছেন।
যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই নিয়মনীতি মেনে দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুবক্তগীনের বিষয়ে তাঁর সহকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, তিনি দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়মকে প্রশ্রয় না দিয়ে নীতিনিষ্ঠভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে সরকারি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি একটি প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
দোহাজারী – কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প। পাহাড়ি এলাকা, জটিল প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ এবং নানা বাস্তব সমস্যার মধ্যেও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষ পরিকল্পনা, সমন্বয় ও নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। একজন প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব শুধু নির্মাণকাজ তদারকি করা নয়; বরং সময়, ব্যয় এবং গুণগত মানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব সফলভাবে পরিচালনায় সহায়ক হয়।
রেলে কর্মরত কর্মচারীরা জানান, মো. সুবক্তগীন যখন পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন তখনো তিনি কোন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেননি। নিজে কোন অনৈতিক সুবিধার কাছে চরিত্র বিক্রি করেননি এমনকি কাউকে অনিয়ম করতেও দেননি। সরকারের বরাদ্দ প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা ছিল এই কর্মকর্তার। এসি রুমে বসে না থেকে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন তিনি। কাজের গুনগত মান ঠিক আছে কিনা তা তদারকি করেছেন নিয়মিত। পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন সাইট। তাঁর সততা এবং দক্ষতার পুরস্কার হিসেবে দোহাজারী কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের ১১তম পিডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। তাঁর সময়েই কাজের গুনগত মান ঠিক রেখে প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। এর ফলে হয়তো অনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কেউ কেউ। আর তাদেরই কিছু বিপদগামী কর্মকর্তা সুবক্তগীনের এগিয়ে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সূত্র জানায়, রেলের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন। যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি, সময়মতো ট্রেন পরিচালনা, অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করাকে তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন। আর এই দায়িত্বের দায়বদ্ধতা থেকে ছুটে চলছেন এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। সমস্যা সমাধানে ভিজিট করছেন রেললাইন, স্টেশন, কারখানাসহ সবখানে। যখনই কোন সমস্যা তৈরি হয়েছে তাৎক্ষণিক তা সমাধের চেষ্টা করছেন। নিরাপদ যাত্রীসেবার মান যাচাইয়ে নিজেই বিভিন্ন ট্রেন পরিদর্শনে গিয়ে যাত্রীদের সাথে কথা বলছেন, নানা অভিযোগ শুনে সমাধান করছেন। খাবারের মান ঠিক রাখতে ক্যাটারিং কোম্পানীগুলোকে চাপে রাখেন সবসময়। এছাড়া বিনা টিকেটে যাত্রী পরিবহন ঠেকাতে আকস্মিক পরিদর্শনে চলে যাচ্ছেন এখনো। বিগত ঈদগুলোতেও তাঁর দায়িত্বশীল বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
একজন সৎ ও দক্ষ অফিসার হিসেবে কাজের চেয়ে দুর্নীতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা অনেক কঠিন। আর সেই কাজটি করতে গিয়ে অনেকের রোষানলে পড়ছেন তিনি। কাজ ও সততায় তাঁর সমকক্ষে আসতে না পেরে অনেকেই তাকে দমানোর জন্য বেছে নেন ভিন্ন পথ। বদনাম রটাতে পেছনে লেগে যান দুর্নীতিবাজ টিমের সদস্যরা। কারণ তাকে সরাতে পারলেই যেন তাদের বিজয় হবে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে রেলের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং ডিজিও তাঁর সততা ও দক্ষতায় সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে দক্ষ জনবল তৈরি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং সুষ্ঠু তদারকির বিকল্প নেই। একজন প্রশাসকের সফলতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাঁর নেতৃত্বে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়মতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং সেবাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার উন্নয়নে অবকাঠামো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব। সুবক্তগীন তাঁর বিভিন্ন দায়িত্বে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতেও যদি দক্ষতা, সততা, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রেল পরিচালিত হয়, তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










