আজ বৃহস্পতিবার ║ ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ║ ২১শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলন

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on twitter
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা, জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়ে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে “বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রাক-বাজেট (২০২৬-২৭) সংবাদ সম্মেলন”।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে চট্টগ্রামের তাসফিয়া রেস্টুরেন্টে  ক্লিন, আইএসডিই বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
পরিবেশ প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রামের সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহউজ্জামানের সভাপতিত্বে এবং সিআরসিডির নির্বাহী পরিচালক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহউজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়ন মডেল পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।” তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে এস এম নাজের হোসাইন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বারবার চাপের মুখে পড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং আমদানিনির্ভর নীতির কারণে জনগণকে উচ্চমূল্যের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরইবি ও পিবিএসের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সেবায় এখনও বড় ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী অনেক এলাকাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকে, যা উন্নয়ন ও জনজীবনের জন্য উদ্বেগজনক।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, এলএনজি ও কয়লার মূল্য অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভর্তুকির চাপ বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখনও প্রধানত গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করছে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বক্তারা আরও বলেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর (পিবিএস) অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল সংকট এবং ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে গ্রামীণ জনগণ শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগে। আরইবি ও পিবিএসের মধ্যকার বৈষম্য, অসন্তোষ এবং নীতিগত দুর্বলতা দূর করে মানসম্মত বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
 বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনও খুবই সীমিত। অথচ রুপটপ সোলার, সোলার ইরিগেশন, এগরিভোলটেইকস, ফ্লোটেভোলটেইকস, নেট মিটারিং এবং কমিউনিটি ওয়ন্ড এনার্জি সিস্টেম  দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ উপলক্ষে ১১ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর কর-শুল্ক হ্রাস, সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়ন, নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নতুন প্রকল্প নিরুৎসাহিত করা, জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন, কমিউনিটিভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর, আরইবি-পিবিএস সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণা তহবিল গঠন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার জন্য পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী, কনজ্যুমারস মিডিয়া অ্যালায়েন্সের সভাপতি আলমগীর সবুজ, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি ও দৈনিক সকালের সময়ের ব্যুরো প্রধান এস এম পিন্টু, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ব্যুরো প্রধান অনুপম দাস, দৈনিক আমাদের সময়ের ব্যুরো প্রধান ম. হামিদুল্লাহ, বাংলানিউজ এর আল রহমান, চট্টলার খবরের মরিয়ম জাহান মুন্নী, ডেইলি স্টারের মিজানুর রহমান, দৈনিক পূর্বদেশের এম এ হোসেন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ব্যুরো প্রধান মোহাম্মদ ইলিয়াছ, পরিবেশ প্রতিবেশ ফোরাম-চট্টগ্রামের সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস এবং মোহাম্মদ জানে আলম।
অনুষ্ঠানে পরিবেশকর্মী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষার্থী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে।
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on linkedin
Share on telegram
Share on skype
Share on pinterest
Share on email
Share on print