আজ বুধবার ║ ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ║ ১লা রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

সর্বশেষ:

    সাইফুল হকের ত্যাগকে মূল্যায়ন করা উচিৎ বিএনপির

    Share on facebook
    Share on whatsapp
    Share on twitter

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটভিত্তিক আন্দোলন, মতাদর্শিক সংগ্রাম এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাপথে অনেক নেতা রয়েছেন যারা বড় দলের ছায়ায় থেকেও নিজেদের আদর্শ, সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মধ্যে সাইফুল হক একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থী রাজনীতির ধারক-বাহক এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দলকে জোটসঙ্গী হিসেবে একটিমাত্র আসন (ঢাকা-১২) দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণেই তিনি পরাজিত হন। জোট থেকে পুরো দলের জন্য একটি মাত্র আসন নেওয়ার প্রেক্ষাপটে এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ভোটের সমীকরণ জটিল হয়ে পড়ায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, জোটের দীর্ঘ আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ একজন নেতাকে এখন বিএনপির সুসময়ে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
    সাইফুল হকের রাজনৈতিক জীবন কেবল নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং স্বৈরাচারবিরোধী ধারাবাহিক কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যখনই দমন-পীড়ন নেমে এসেছে, তখনই তিনি মাঠে থেকে অবস্থান নিয়েছেন। তার রাজনৈতিক চর্চা মূলত আদর্শনির্ভর, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, শ্রমিকের অধিকার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের প্রশ্নে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতার কারণেই বৃহত্তর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তার দলের ঐক্য গড়ে ওঠে।
    বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জোট রাজনীতিতে সাইফুল হকের অংশগ্রহণ কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক অধিকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছিল সময়ের দাবি। সাইফুল হক সেই ঐক্যকে কেবল আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেননি, বরং মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয় থেকেছেন। গ্রেপ্তার, মামলা, হয়রানি, সবকিছু সত্ত্বেও তিনি জোটের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। ফলে বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তার উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান ও তাৎপর্যপূর্ণ।
    ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জোট রাজনীতির বাস্তবতা ছিল জটিল। আসন বণ্টনের প্রশ্নে বড় দলগুলো প্রাধান্য পেলেও ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব সীমিত ছিল। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য একটি মাত্র আসন বরাদ্দ পাওয়াটা একদিকে যেমন জোটের বাস্তবতা, অন্যদিকে তা ছিল রাজনৈতিক পরীক্ষাও। ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল হকের প্রার্থিতা ছিল প্রতীকী ও বাস্তব, দুটোই। তিনি সেখানে কেবল একটি দলের প্রার্থী ছিলেন না; বরং জোটের ঐক্য ও আদর্শিক বহুত্ববাদের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামায়াত জোটের প্রভাবে ভোটের সমীকরণ পাল্টে যায়। ফলাফল তার অনুকূলে না এলেও রাজনৈতিক দায়-দায়িত্বের প্রশ্নে তার ভূমিকা প্রশ্নাতীত।
    এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, রাজনীতিতে মূল্যায়ন কীসের ভিত্তিতে হওয়া উচিত? কেবল নির্বাচনী ফলাফলের ওপর, নাকি দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও অবদানের ওপর? সাইফুল হকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থেকেছেন। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি কেবল বক্তব্য দেননি; বরং রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন। জোটের সমন্বয় সভা, কর্মসূচি, গণসংযোগ, সব জায়গায় তার উপস্থিতি ছিল ধারাবাহিক। এমন একজন নেতাকে কেবল একটি নির্বাচনী পরাজয়ের কারণে উপেক্ষা করা হলে তা রাজনৈতিকভাবে সংকীর্ণতা নির্দেশ করবে।
    বিএনপির জন্যও এটি একটি রাজনৈতিক পর্যালোচনার বিষয়। একটি বৃহৎ দল হিসেবে বিএনপি যখন দীর্ঘ আন্দোলনের পর তুলনামূলক সুসময় উপভোগ করছে, তখন তাদের জোটসঙ্গীদের প্রতি দায়িত্ব আরও বেশি। জোট রাজনীতির সাফল্য নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও ন্যায্য অংশীদারিত্বের ওপর। যদি ছোট দলগুলো মনে করে যে তারা কেবল আন্দোলনের সময় প্রয়োজনীয়, কিন্তু ক্ষমতার সময় উপেক্ষিত, তাহলে ভবিষ্যতে ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সাইফুল হকের মূল্যায়ন সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
    মন্ত্রীত্ব প্রশ্নটি এখানে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। মন্ত্রী হওয়া মানেই কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বরং তা রাজনৈতিক স্বীকৃতিরও প্রতিফলন। সাইফুল হক যদি কোনো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পান, তবে তা জোট রাজনীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে শক্তিশালী করবে।
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, আন্দোলনের সময় যারা অগ্রভাগে থাকেন, ক্ষমতার সময় তারা প্রান্তিক হয়ে পড়েন। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়। কারণ এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে হতাশা জন্ম নেয় এবং জোটের ভেতরে অবিশ্বাস বাড়ে। সাইফুল হকের মতো নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে, আদর্শ ও ত্যাগের রাজনীতি একদিন স্বীকৃতি পায়।
    আরেকটি দিক বিবেচনা করা জরুরি, বহুদলীয় গণতন্ত্রে মতাদর্শিক বৈচিত্রকে সম্মান করা। বিএনপির সঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মতাদর্শিক পার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাদের ঐক্য ছিল কৌশলগত। এই ঐক্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে সম্মানজনক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাইফুল হকের মূল্যায়ন সেই অংশীদারিত্বের প্রতীক হতে পারে।
    এছাড়া, নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে যে বিদ্রোহী প্রার্থী ও সমন্বয়ের ঘাটতি কাজ করেছে, তা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হিসেবে নেওয়া উচিত। জোটের ভেতরে সমন্বয়হীনতা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে প্রার্থী নির্ধারণ ও প্রচারণায় সুস্পষ্ট কৌশল থাকা প্রয়োজন। সাইফুল হকের অভিজ্ঞতা জোটকে এই বিষয়ে পরিপক্ক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।
    রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা। সাইফুল হক তার বক্তব্যে ও কর্মকাণ্ডে সবসময় রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখেছেন। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, নীতিগত সমালোচনাই ছিল তার কৌশল। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজন। তাকে মূল্যায়ন করা মানে এই সংস্কৃতিকে উৎসাহ দেওয়া।
    সাইফুল হকের মূল্যায়ন প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক চর্চার মান এবং রাজনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন। বিএনপি যদি তার দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে অবদানকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে উপযুক্ত দায়িত্বে আসীন করে, তবে তা কেবল একজন নেতার সম্মান রক্ষা করবে না; বরং জোট রাজনীতির ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে। গণতন্ত্রের পথে এগোতে হলে ত্যাগ, আদর্শ ও অংশীদারিত্বের মূল্যায়ন অপরিহার্য। সাইফুল হকের ক্ষেত্রে সেই মূল্যায়ন অতিরিক্ত কিছু নয়।
    লেখক: সাংবাদিক ও কবি, সভাপতি রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

    Share on facebook
    Share on twitter
    Share on whatsapp
    Share on linkedin
    Share on telegram
    Share on skype
    Share on pinterest
    Share on email
    Share on print