আজ সোমবার ║ ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ║৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ║ ২৮শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

সর্বশেষ:

    আবুল হাশেম বক্করের ত্যাগকে মূল্যায়ন করা উচিৎ

    Share on facebook
    Share on whatsapp
    Share on twitter

    একজন ব্যক্তির মূল্যয়ন শুধুমাত্র তাঁর প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার প্রশ্ন। যে সমাজ তার সংগ্রামী নেতাদের অবদান স্মরণ করে, মূল্যায়ন করে এবং ইতিহাসে সংরক্ষণ করে, সেই সমাজই ভবিষ্যতে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে। আবুল হাশেম বক্করের রাজনৈতিক জীবন, বিশেষত চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে তার ভূমিকা, দলীয় দুঃসময়ে তার সক্রিয় উপস্থিতি, মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত-পরিবারিক জীবনে ত্যাগ তাকে মূল্যায়নের দাবিদার করে তোলে।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন সময় এসেছে, যখন বিরোধী রাজনীতি করা মানেই ছিল ঝুঁকি নেওয়া। গ্রেফতার, মামলা, হামলা, নজরদারি, এসব ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। সেই কঠিন সময়ে যারা সংগঠন ধরে রেখেছেন, কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, মাঠে থেকেছেন, তাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আলাদা করে স্থান পাওয়ার যোগ্য। আবুল হাশেম বক্কর চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এমনই এক সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন, যখন দলকে সংগঠিত রাখা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি।
    রাজনৈতিক দায়িত্ব মানে কেবল সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়া নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যে সংগঠনকে সচল রাখা, হতাশ কর্মীদের সাহস জোগানো, নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের সংযোগ বজায় রাখা। একজন সদস্য সচিব হিসেবে আবুল হাশেম বক্করের দায়িত্ব ছিল সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় রাখা, আন্দোলন-সংগ্রামে সমন্বয় করা এবং দুঃসময়ে নেতৃত্বের বার্তা মাঠে পৌঁছে দেওয়া। এই কাজগুলো অনেক সময় প্রচারের আলোয় আসে না, কিন্তু সংগঠন টিকে থাকার পেছনে এগুলোই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
    বিএনপির দুঃসময়ে যখন অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার বা গা-ঢাকা অবস্থায় ছিলেন, তখন মাঠে সরব থাকা মানে ছিল ঝুঁকি নেওয়া। আবুল হাশেম বক্কর সেই ঝুঁকি নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, যা রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এসেছে। মামলার আসামি হয়ে বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালানো সহজ বিষয় নয়। আদালতে হাজিরা, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবার ও কর্মজীবনের চাপ, সব মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাননি।
    একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ব্যক্তিগত জীবনে। যখন পরিবারকে সময় দেওয়া যায় না, সন্তানদের বেড়ে ওঠা কাছ থেকে দেখা যায় না, স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়, তখন বুঝতে হয় তিনি কতটা ত্যাগ স্বীকার করছেন। আবুল হাশেম বক্কর ঠিকমতো বাসায় থাকতে পারেননি, পরিবারকেও সময় দিতে পারেননি, এই বাস্তবতা তার সংগ্রামের গভীরতা বোঝায়। রাজনৈতিক আদর্শ ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য থেকে দূরে রেখেছে। এই ত্যাগ অস্বীকার করা যায় না।
    আমাদের সমাজে অনেক সময় নেতাদের কেবল ফলাফল দিয়ে বিচার করা হয়। কিন্তু সংগ্রামের সময় তাদের অবদান, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং সংগঠন রক্ষায় আত্মত্যাগের বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে। আবুল হাশেম বক্করের মূল্যায়ন করতে হলে তার দায়িত্বকালীন প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। চট্টগ্রাম মহানগর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চল। এখানে সংগঠন সক্রিয় রাখা মানে ছিল সমগ্র অঞ্চলে দলের অবস্থান শক্ত রাখা। সেই দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন প্রতিকূলতার মধ্যেও।
    নেতৃত্বের একটি বড় গুণ হলো সংকটে স্থির থাকা। সহজ সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ; কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। যখন মামলা, গ্রেফতার ও চাপের মধ্যে থেকেও কেউ সংগঠনের জন্য কাজ করে যান, তখন বোঝা যায় তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কতটা দৃঢ়। আবুল হাশেম বক্করের ক্ষেত্রে এই দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার ধারাবাহিক সক্রিয়তায়। তিনি কেবল নামমাত্র পদে ছিলেন না; মাঠে থেকেছেন, কর্মসূচিতে ছিলেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
    রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় সমস্যা হলো, দুঃসময়ের কর্মীরা অনেক সময় সুসময়ে উপেক্ষিত হন। যারা প্রতিকূল সময়ে দলের পতাকা ধরে রাখেন, তারা পরবর্তীতে যথাযথ মূল্যায়ন পান না। এই প্রবণতা বদলানো প্রয়োজন। আবুল হাশেম বক্করের মতো নেতাদের মূল্যায়ন মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বার্তা দেওয়া যে ত্যাগ ও সংগ্রাম বৃথা যায় না। এতে তরুণরা অনুপ্রাণিত হয় এবং সংগঠনের প্রতি আস্থা বাড়ে।
    একজন নেতার মূল্যায়ন করতে হলে তার ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও বিবেচনায় নিতে হয়। তিনি কি কর্মীদের আস্থা অর্জন করেছেন? তিনি কি দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আন্তরিক ছিলেন? তিনি কি নিজের নিরাপত্তার চেয়ে সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন? আবুল হাশেম বক্করের জীবন ও কর্মকাণ্ডের আলোচনায় এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি রাজপথে ছিলেন, এটি তার দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
    এছাড়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, বাসায় ঠিকমতো থাকতে না পারা, এগুলো কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা। একজন নেতার পরিবারও তার সঙ্গে সংগ্রামে অংশ নেয়। সন্তানরা বাবাকে কাছে পায় না, স্ত্রী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান, পরিবার উদ্বেগে থাকে। এই ত্যাগের স্বীকৃতি সমাজের দেওয়া উচিত। আবুল হাশেম বক্করের মূল্যায়ন মানে তার পরিবারের ত্যাগকেও স্বীকৃতি দেওয়া।
    সমালোচনা ও মূল্যায়নের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সমালোচনা অনেক সময় আবেগনির্ভর হয়; মূল্যায়ন হয় তথ্য ও প্রেক্ষাপটনির্ভর। আবুল হাশেম বক্করের ক্ষেত্রে যদি কোনো সীমাবদ্ধতা থেকেও থাকে, তা নিরপেক্ষভাবে আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু তার সংগ্রাম, মামলা, মাঠে উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ অস্বীকার করা যায় না। এই বিষয়গুলো তাকে রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেয়।
    চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার ভূমিকা দলীয় কাঠামোকে সচল রাখতে সহায়তা করেছে, এমন ধারণা অনেক কর্মীর মধ্যেই রয়েছে। একজন সদস্য সচিবের কাজ অনেক সময় আড়ালে থাকে, কিন্তু বাস্তবে সংগঠনের প্রাণচাঞ্চল্য তার উপর নির্ভর করে। কর্মসূচির পরিকল্পনা, সমন্বয়, যোগাযোগ, এসব দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন কঠিন পরিস্থিতিতেও। এই ধারাবাহিকতা তাকে মূল্যায়নের দাবিদার করে তোলে।
    সবশেষে বলা যায়, আবুল হাশেম বক্করকে মূল্যায়ন করা উচিত, কারণ তিনি শুধু একটি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না; তিনি দুঃসময়ের একজন কর্মী, একজন সংগঠক এবং একজন সংগ্রামী নেতা। মামলা, গ্রেফতার-ভীতি, ব্যক্তিগত ত্যাগ, সবকিছুর মধ্যেও তিনি দলের পাশে থেকেছেন। তার এই অবদান স্বীকৃতি পেলে তা কেবল একজন ব্যক্তির সম্মান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ। যে সংস্কৃতি ত্যাগকে সম্মান করে, সংগ্রামকে স্মরণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেয়, সেই সংস্কৃতিই একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাজনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে। আবুল হাশেম বক্করের মূল্যায়ন তাই সময়ের দাবি এবং ইতিহাসের দায়িত্ব।
    আবুল হাশেম বক্কর দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে বিলুপ্ত হওয়া আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে ওই আসনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী আবু সুফিয়ানের পক্ষ হয়ে প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বক্করের মনোনয়নপত্র গ্রহণ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এছাড়া তিনি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং বিএনপির রাষ্ট্র মেরামতের ‘৩১ দফা’র পক্ষে জনমত তৈরিতে সক্রিয় ছিলেন।
    লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

    Share on facebook
    Share on twitter
    Share on whatsapp
    Share on linkedin
    Share on telegram
    Share on skype
    Share on pinterest
    Share on email
    Share on print