ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না, আজ আপনার তো কাল আরেকজনের। মানুষ যেমন মরণশীল ক্ষমতাও তেমন পতনশীল। মানুষের মরণ আর ক্ষমতার পতন অনিবার্য, শুধু সময়টা মানুষের জানা নেই। কিন্তু মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ এই সহজ সত্যটি সবচেয়ে বেশি ভুলে যায়। ক্ষমতার মোহ এমন এক নেশা, যা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পৃথিবীর ইতিহাস মূলত ক্ষমতার উত্থান ও পতনের ইতিহাস। রাজা, সম্রাট, সাম্রাজ্য, স্বৈরশাসক, একনায়ক, সবাই একসময় নিজেদের অপরাজেয় ভেবেছে। কিন্তু সময় বারবার প্রমাণ করেছে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, আর তার অপব্যবহার শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।
ক্ষমতা আসলে কী? এটি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার নয়, এটি মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা। এই প্রভাব যখন ন্যায়, দায়িত্ব ও মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন ক্ষমতা আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন ক্ষমতা অহংকার, প্রতিশোধ ও লোভের হাতিয়ার হয়, তখন তা অভিশাপে রূপ নেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই, ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, বরং মানুষ ক্ষমতাকে বড় বা ছোট করে তোলে।
প্রাচীন বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফেরাউনরা নিজেদের ঈশ্বর মনে করত। মিশরের বিশাল পিরামিড আজও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেই ফেরাউনরা কোথায়? তাদের ক্ষমতা ছিল সীমাহীন, কিন্তু সময়ের কাছে তারা পরাজিত। পিরামিড আজ স্মৃতিচিহ্ন, ক্ষমতার স্থায়িত্বের নয়, বরং ক্ষমতার অহংকারের।
রোমান সাম্রাজ্য একসময় পৃথিবীর অর্ধেক শাসন করত। তাদের সেনাবাহিনী ছিল অপ্রতিরোধ্য, আইন ছিল কঠোর, শাসন ছিল দৃঢ়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, ক্ষমতার লড়াই ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার ধীরে ধীরে সেই বিশাল সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। রোমানরা ভাবেনি, তাদের পতন হতে পারে। কিন্তু সময় তাদের অহংকার ভেঙে দিয়েছে।
মধ্যযুগে ইউরোপে রাজারা নিজেদের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী মনে করত। তারা ভাবত, জনগণ জন্মগতভাবেই শাসিত হওয়ার জন্য সৃষ্টি। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় শোষণ, নিপীড়ন, করের বোঝা। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব দেখিয়ে দেয়, ক্ষমতার ভিত্তি যদি জনগণের সম্মতি না হয়, তবে একদিন সেই ক্ষমতা রক্তের স্রোতে ভেসে যাবে। রাজা ষোড়শ লুইয়ের ক্ষমতা, রাজপ্রাসাদ, সেনাবাহিনী, কিছুই তাকে রক্ষা করতে পারেনি।
বিশ শতকের ইতিহাস ক্ষমতার অস্থায়িত্বের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণে ভরপুর। অ্যাডলফ হিটলার নিজেকে জার্মানির ত্রাতা মনে করতেন। তার বক্তৃতায় মানুষ উন্মাদ হয়ে উঠত, তার নির্দেশে রাষ্ট্র চলত। তিনি ভেবেছিলেন, শক্তির জোরে পুরো পৃথিবীকে নত করা যাবে। কিন্তু তার ক্ষমতার শেষ হয়েছিল ধ্বংসস্তূপের নিচে, লজ্জাজনক পরাজয়ে। ক্ষমতার নেশা তাকে অমানবিক করে তুলেছিল, আর সেই অমানবিকতার মূল্য দিতে হয়েছিল লাখো নিরপরাধ মানুষকে।
ইতালির মুসোলিনি, স্পেনের ফ্রাঙ্কো, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন সবাই ভেবেছিল তাদের ক্ষমতা অটুট। বিরোধী কণ্ঠ দমন, ভয় দেখানো, কারাগার, এসব দিয়ে তারা নিজেদের শক্তিশালী প্রমাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই ইতিহাসের বিচার এড়াতে পারেনি। ক্ষমতা হারানোর পর তারা হয়ে গিয়েছিল একা, অসহায়, প্রায় তুচ্ছ।
এশিয়ার ইতিহাসেও একই চিত্র। চীনের সম্রাটরা ‘স্বর্গীয় অধিকার’-এর কথা বলত। তারা ভাবত, আকাশ তাদের পক্ষে। কিন্তু দুর্নীতি, নিষ্ঠুরতা আর সাধারণ মানুষের কষ্ট একসময় বিদ্রোহে রূপ নেয়। রাজবংশ বদলেছে, সম্রাট বদলেছে, কিন্তু সত্যটি একই থেকেছে, ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সূর্যাস্তহীন বলে পরিচিত ছিল। তারা ভাবত, তাদের শাসন কখনো শেষ হবে না। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের অত্যাচার, বৈষম্য ও শোষণ শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনকে জন্ম দেয়। অহিংস আন্দোলন, গণপ্রতিরোধ প্রমাণ করে দেয়, ক্ষমতার জোরে মানুষকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, জনপ্রিয়তা কমেছে-বেড়েছে, আর জনগণের রায়ই শেষ কথা হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তিনি জাতির অবিসংবাদিত নেতৃত্বে আসেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর সামরিক সহায়তায় রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ এরপর আবু সাদাত মো. সায়েম। এরপর ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন এবং গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন। তিনি বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ ক্ষমতায় আসেন এবং প্রায় ৯ বছর দেশ শাসন করেন। একসময় মনে হচ্ছিল তাঁর শাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। পরবর্তীতে তিনি কারাবরণও করেন।
১৯৯১ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিক ধারায় বাংলাদেশে প্রধানত দুটি দলের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আবার নির্বাচনে পরাজিতও হয়েছেন। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর খুব অসহায় হয়ে পড়ে বিএনপি। শেখ হাসিনাও একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছেন এবং বিরোধী দলেও ছিলেন।
২০০৮ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। টানা ১৬ বছর দেশ শাসন করেছেন তিনি। বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধী মত দমন নিপীড়নের অভিযোগে ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে দলীয় প্রধানসহ অনেক প্রভাবশালী নেতা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন। ওইসময়ে কেউ আওয়ামী লীগ পরিচয় দিতেও ভয় পেতেন।
বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়, যা হলো, ক্ষমতা এক প্রকার অস্থায়ী দায়িত্ব। যারা এটি উপলব্ধি করেন, তারা জনগণের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেন। আর যারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী ভাবেন, ইতিহাস তাদের ভুল প্রমাণ করে। ক্ষমতা নয়, জনগণই স্থায়ী।
ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভুল হলো, এটি মানুষকে ভুল ধারণা দেয় যে, সে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। ক্ষমতাবানরা প্রায়ই মনে করে, আইন তাদের জন্য নয়, নিয়ম অন্যদের জন্য। এই ভাবনাই ক্ষমতার পতনের বীজ বপন করে। কারণ ক্ষমতা যখন ন্যায়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা নিজের বৈধতাই হারিয়ে ফেলে।
ক্ষমতার অপব্যবহারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো অত্যাচার। ক্ষমতার জোরে কাউকে অপমান করা, নিপীড়ন করা, কণ্ঠরোধ করা,এসব শুধু ভুক্তভোগীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পুরো সমাজকে বিষাক্ত করে তোলে। ভয় ও নীরবতার সমাজ কখনো সুস্থ হতে পারে না। ইতিহাসে দেখা গেছে, যেখানে ভয় রাজত্ব করে, সেখানে বিদ্রোহ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতার ভিন্ন এক উদাহরণ। দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবন্দি থাকার পর তিনি যখন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতায় এলেন, তখন চাইলে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতাকে প্রতিহিংসার অস্ত্র না বানিয়ে পুনর্মিলনের মাধ্যম বানিয়েছিলেন। তার নেতৃত্ব দেখিয়ে দেয়, ক্ষমতা চিরস্থায়ী না হলেও, মানবিকতা ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকে।
মহাত্মা গান্ধীর কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল না, কোনো সেনাবাহিনী ছিল না। তবুও তার নৈতিক প্রভাব একটি সাম্রাজ্যকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, ক্ষমতার প্রকৃত শক্তি দাপটে নয়, নৈতিকতায়।
ক্ষমতা মানুষকে দুইভাবে পরীক্ষা করে, এক, সে কতটা দায়িত্বশীল; দুই, সে কতটা সংযত। সংযমহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারে পরিণত হয়। আর স্বৈরাচার মানেই পতনের দিকে যাত্রা।
আজকের পৃথিবীতেও এই বাস্তবতা বদলায়নি। রাষ্ট্র হোক বা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি হোক বা কর্পোরেট জগৎ, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই অপব্যবহারের ঝুঁকি আছে। একজন ম্যানেজার যদি ক্ষমতার জোরে কর্মচারীকে অপমান করে, একজন নেতা যদি বিরোধী মত দমন করে, একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি দুর্বলকে পিষে ফেলে, তবে তা বড় বা ছোট যাই হোক, একই নীতির বহিঃপ্রকাশ।
ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না, এই সত্য উপলব্ধি করলে আচরণ বদলায়। মানুষ তখন ভয় দেখিয়ে নয়, সম্মান দিয়ে কাজ আদায় করতে চায়। আদেশ দিয়ে নয়, উদাহরণ দিয়ে নেতৃত্ব দিতে চায়। কারণ সে জানে, আজ সে ক্ষমতাবান, কাল সে সাধারণ মানুষ।
ইতিহাসের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিরা তারা নয়, যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল; বরং তারা, যারা ক্ষমতায় থেকেও মানবিক থাকতে পেরেছিল। আব্রাহাম লিংকন গৃহযুদ্ধের সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হননি। তার নেতৃত্ব আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
ক্ষমতার স্থায়িত্বের চেয়ে তার ব্যবহার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তার মেয়াদ শেষ হলেও তার প্রভাব থেকে যায়। কিন্তু ক্ষমতা যদি অত্যাচারের হাতিয়ার হয়, তবে তার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণাও উত্তরাধিকার হয়ে থাকে।
মানুষের শেখার সবচেয়ে বড় জায়গা ইতিহাস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষ ইতিহাস পড়ে কম, ভুলে বেশি। প্রতিটি পতিত স্বৈরশাসক, প্রতিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সাম্রাজ্য যেন নীরবে বলে, ক্ষমতার জোরে কাউকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না।
যদি ক্ষমতাবানরা এই সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করত, তবে পৃথিবী অনেক কম নিষ্ঠুর হতো। তারা বুঝত, ক্ষমতা মানে অধিকার নয়, দায়িত্ব। ক্ষমতা মানে উঁচুতে বসা নয়, বরং বেশি ভার বহন করা।
শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা চলে যায়, থেকে যায় কাজ। মানুষ মনে রাখে, কে কাকে ভয় দেখিয়েছে তা নয়, বরং কে কাকে সম্মান দিয়েছে। ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না, কিন্তু মানবিক আচরণ ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়।
এই উপলব্ধিই মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত, ক্ষমতার জোরে কাউকে অত্যাচার নয়, বরং ক্ষমতার মাধ্যমে মানুষকে শক্তিশালী করা। কারণ একদিন ক্ষমতা থাকবে না, কিন্তু সেই আচরণের বিচার ইতিহাস হয়ে থাকবে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, সভাপতি, রেলওয়ে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।