চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে ঘিরে ১৭ নং পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে আগাম নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যেই নতুন অনেক মুখের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই 'বসন্তের কোকিলদের' ভিড়েও সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল কর্মীদের মাঝে জনপ্রিয়তা ও আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজপথের পরীক্ষিত সৈনিক এ কে এম আরিফুল ইসলাম ডিউক। ২০১৯ এবং ২০২১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে যখন বিএনপি পরিচয় দেওয়া মানেই ছিল অবর্ণনীয় হামলা আর মামলার শিকার হওয়া, তখন জীবন বাজি রেখে বাকলিয়ার রাজনৈতিক দুর্গ আগলে রেখেছিলেন এই তরুণ নেতা।
ঐতিহাসিক ‘মিষ্টি কুমড়া’ ও ব্যালট বিপ্লব
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের উপ-নির্বাচনে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করেনি। তবে দলের সুচিন্তিত সিদ্ধান্তে 'মিষ্টি কুমড়া' প্রতীককেই অঘোষিতভাবে ধানের শীষ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেই কঠিন সময়ে যখন সারা দেশে আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য, তখন প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জনগণের সরাসরি ভোটে ডিউকের বিজয় ছিল বাকলিয়ার ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। ওই নির্বাচনে ডিউক ৩,১৬৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে তাঁর নিকটতম আওয়ামী লীগ সমর্থিত 'ট্রাক্টর' প্রতীকের প্রার্থী শহিদুল আলম পেয়েছিলেন ২,৭৯৬ ভোট। ৩৬৯ ভোটের এই ব্যবধান সেদিনই প্রমাণ করেছিল যে, প্রতিকূল পরিবেশেও পশ্চিম বাকলিয়া বিএনপির এক অপরাজেয় ঘাঁটি।
অফিসিয়াল সিন্ডিকেট ভেঙে জনসেবা নিশ্চিত
ডিউকের স্বল্পকালীন শাসন আমলের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল কাউন্সিলর কার্যালয়ে সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার সহজলভ্যতা। এর আগে যেখানে জাতীয় সনদপত্র (এনআইডি) বা চারিত্রিক সনদ পেতে কাউন্সিলর অফিসে এক থেকে দুই দিন ঘুরতে হতো, সেখানে ডিউকের সময়ে তা মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হতো বলে একাধিক সেবাপ্রার্থী নিশ্চিত করেছেন।
বিশেষ করে জন্ম নিবন্ধন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রবাদ প্রায় প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল— "জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা আর পুনরায় জন্মগ্রহণ করা একই কষ্টের সমান।" কিন্তু ডিউকের সময়ে এই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ বা সমস্যা সমাধানে তিনি এতটাই তৎপর ছিলেন যে, অনেক সময় রাত বারোটার সময়ও মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় জন্ম নিবন্ধন সেবা যথাযথ সময়ে পেয়েছেন। এই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সিন্ডিকেটমুক্ত সেবাই মূলত তাঁকে জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে।
উত্তরাধিকার ও মাস্টার জাফরের উন্নয়ন দর্শন
এলাকাবাসীর মতে, ডিউক মূলত তাঁর পিতা, বাকলিয়ার কিংবদন্তি কাউন্সিলর মাস্টার জাফরের অসমাপ্ত কাজ ও উন্নয়ন দর্শনকে এগিয়ে নিতেই রাজনীতিতে আসেন। মাস্টার জাফর সাহেব মৃত্যুর আগে এলাকার জনগণের জন্য যে সুনির্দিষ্ট উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ডিউক তাঁর সংক্ষিপ্ত মেয়াদে তার অনেকটা বাস্তবায়ন করেছেন। কাউন্সিলর থাকাকালীন তিনি এলাকার জরাজীর্ণ রাস্তাঘাট পাকা করা এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করেছেন, যার প্রমাণ আজও এলাকার অলিগলিতে উন্নয়নের ফলকে দৃশ্যমান। বাবার দেওয়া কথা রাখতে গিয়ে তিনি ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষের সেবায় দিনরাত এক করেছেন।
হিংস্রতা ও আমজাদ-সেলু বাহিনীর তাণ্ডব
ডিউকের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও সাধারণ মানুষের আস্থাই মূলত তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ২০২১ সালের চসিক নির্বাচনের ডামাডোল চলাকালীন ২৪ জানুয়ারি লালদীঘি ময়দানের বিশাল জনসমুদ্রে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন যখন এই লড়াকু সৈনিক ডিউকের হাত উঁচিয়ে তাঁকে পুনরায় প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন, তখন থেকেই তাঁর ওপর নেমে আসে প্রতিহিংসার খড়গ। এই ঘোষণার পর বাকলিয়ার রাজপথে রাজত্ব করা আওয়ামী লীগের চিহ্নিত ক্যাডার আমজাদ ও সেলু বাহিনী ডিউকের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় এবং একজন সংবাদকর্মীর বাসায় বর্বরোচিত হামলা চালায়। সিসিটিভি ফুটেজে এই নারকীয় হামলার অকাট্য প্রমাণ থাকলেও তৎকালীন প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
শিষ্টাচার ও তৃণমূলের প্রাণের স্পন্দন
তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, ডিউক একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ হয়েও মুরুব্বি ও প্রবীণ নেতাদের প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনয় প্রদর্শন করেন, তা বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে বিরল। নিজের কোনো ব্যক্তিগত দম্ভ নেই, বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তে মুরব্বিদের পরামর্শকে শিরোধার্য করেন তিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক প্রবীণ নেতা বলেন, “বিপদের দিনে যখন অনেকেই ঘরের কোণে লুকিয়ে ছিল, তখন ডিউকই আমাদের কর্মীদের আগলে রেখেছিলেন। তাঁর বিনয় আর মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই তাকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে।”
পর্যবেক্ষণ
আগামী মার্চ পর্যন্ত বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব পালনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই অনেক সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এখন 'ট্রাম্প কার্ড', অদৃশ্য ক্ষমতা ও অর্থের দাপট দেখিয়ে কাউন্সিলর পদ বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা গত ১৫ বছর কোনো না কোনোভাবে প্রশাসনের সাথে সখ্যতা রেখে চলেছে, তারা এখন বিএনপির তকমা লাগিয়ে মাঠে নামার চেষ্টায় লিপ্ত। কিন্তু বাকলিয়াবাসীর মনে প্রশ্ন—যিনি দুঃসময়ে দলের পতাকা হাতে রাজপথে লড়েছেন, ক্যাডারদের হামলা সহ্য করেছেন এবং ক্লিন ইমেজের অধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, সেই ডিউককে কি বিএনপি পুনরায় মূল্যায়ন করবে? ত্যাগের রাজনীতি নাকি অর্থের দাপট—কোনটা জয়ী হবে বাকলিয়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।