চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে ভোটের সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে নারী ভোটার। তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণের আগ্রহও এবার বেশি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে উত্তাপ বাড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় সন্তুষ্ট সাধারণ ভোটাররা। শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে প্রার্থী ও প্রশাসনের সম্মিলিত ভূমিকা কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের মতে, সংখ্যালঘু, নারী ও তরুণ ভোটারদের ওপর নির্ভর করছে এবারের ফলাফল। বিএনপি, জামায়াত ও বৃহত্তর সুন্নি জোট—এই তিন শক্তির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
বিভিন্ন জরিপে পেশাজীবী ও সাধারণ ভোটারদের সমর্থনে বিএনপি মনোনীত সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এগিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা না থাকলে বিপর্যয়ের শঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরওয়ার জামাল নিজাম (ধানের শীষ) পরিকল্পিত শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ উন্নয়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণ, মাদক ও সন্ত্রাস দমন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন।
অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী (দাঁড়িপাল্লা) মাস্টারপ্ল্যানভিত্তিক উন্নয়ন, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জলাবদ্ধতা নিরসন, কর্মসংস্থান ও মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এস এম শাহজাহান (মোমবাতি) বেকারত্ব দূরীকরণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আধুনিক শিক্ষা-চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সুফিবাদী জনতার ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির আব্দুর রব চৌধুরী, এমডিএমের মো. এমরান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মু. রেজাউল মোস্তফা এবং গণ অধিকার পরিষদের মো. মুজিবুর রহমানও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
এবারের চট্টগ্রাম-১৩ আসনে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী, বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী মোমবাতি প্রতীকে এসএম শাহ জাহান, জাতীয় পার্টি মনোনীত আব্দুর রব চৌধুরী, সিংহ প্রতীকে এমডিএম প্রার্থী মো. এমরান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মু. রেজাউল মুস্তফা এবং গণঅধিকার পরিষদের মো. মুজিবুর রহমান।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা ও কর্ণফুলী) আসনের চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের তালিকা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করেছেন। ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুযায়ী নির্বাচন সহায়তা ও সরবরাহ বিভাগের উপ সচিব মো. হুমায়ুন কবির এ তালিকা ঘোষণা করেছেন।
তালিকায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের নাম ও অবস্থান, ভোট কক্ষের সংখ্যা, গ্রামের নাম এবং পুরুষ, মহিলা ও হিজড়া ভোটারের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে দুই উপজেলা—আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অন্তর্ভুক্ত। আনোয়ারা উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন, কর্ণফুলী উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন রয়েছে, মোট দুই উপজেলায় মিলিয়ে ১৬টি ইউনিয়ন।
এতে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৭ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫৩ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৬৭৪, মহিলা ১৩ হাজার ১০১ জন। মোট ভোটার ২৬ হাজার ৭৭৫।
আনোয়ারার বারশত ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৮ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫৫ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৪ হাজার ১০৫, মহিলা ১২ হাজার ৯০৮ জন। মোট ভোটার ২৭ হাজার ১৩ ভোট।
আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৯ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৬৭টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৭ হাজার ৯৫৫, মহিলা ১৬ হাজার ৪৪১ জন। মোট ভোটার ৩৪ হাজার ৩৯৬ জন ভোটার।
আনোয়ারা উপজেলার বটতলী ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৭ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৪৮টি, এতে পুরুষ ভোটার ১২ হাজার ৪৯৫, মহিলা ১১ হাজার ৫৫৩ জন। মোট ভোটার ২৪ হাজার ৪৮ জন।
আনোয়ারা উপজেলার বরুমছড়া ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৬টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৪১ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১১ হাজার ৬৮, মহিলা ১০ হাজার ২৩৯ জন। মোট ভোটার ২১ হাজার ৩০৭।
আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৯ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫৯টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৫ হাজার ৪৪৫, মহিলা ১৪ হাজার ২৯৪ জন। মোট ভোটার ২৯ হাজার ৭৩৯ জন।
আনোয়ারা উপজেলার সদর আনোয়ারা ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৪টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ২৪ টি, এতে পুরুষ ভোটার ৬ হাজার ১০৬, মহিলা ৫ হাজার ৭৪৭ জন। মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৫৩।
আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৬টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৩৯টি, এতে পুরুষ ভোটার ৯ হাজার ৭৩৮, মহিলা ৯ হাজার ২৭২ জন। মোট ভোটার ১৯ হাজার ১০ জন ভোটার।
আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৭ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৪৩ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১১ হাজার ১৮১, মহিলা ৯ হাজার ৮৫৭ জন। মোট ভোটার ২১ হাজার ৩৮ জন।
আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৭ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫৪টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৪২৭, মহিলা ১২ হাজার ৫৪৬ জন। মোট ভোটার ২৫ হাজার ৯৭৩ জোন ভোটার।
আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদন্ডী ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৪টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৩৪ টি, এতে পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ৭৮৯, মহিলা ৭ হাজার ৮৪৯ জন। মোট ভোটার ১৬ হাজার ৬৩৮ জন ভোটার।
এতে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের আনোয়ারা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ৫১৭টি ভোট কক্ষ রয়েছে। এই ১১ ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যা ২,৫৭,৭৯০, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৩৩,৯৮৩ এবং মহিলা ভোটার ১,২৩,৮০৭।
অপরদিকে, একই আসনের কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৮টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫২ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৬২৯, মহিলা ১২ হাজার ৯৮৮ জন। মোট ভোটার ২৫ হাজার ৬১৭ জন ভোটার।
কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৯ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৫২ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৬১ জন, মহিলা ১২ হাজার ২১১ জন। মোট ভোটার ২৫ হাজার ২৭২ জন।
কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১০ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৬৪ টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৬ হাজার ৯৬৫ জন, মহিলা ১৪ হাজার ৯১১ জন। মোট ভোটার ৩১ হাজার ৮৭৬ জন।
কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৬ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৩২ টি, এতে পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ৬৯ জন, মহিলা ৭ হাজার ৪৪২ জন। মোট ভোটার ১৫ হাজার ৫১১ জন।
কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১২ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭৩টি, এতে পুরুষ ভোটার ১৯ হাজার ১৬৬ জন, মহিলা ১৬ হাজার ৮০৩ জন। মোট ভোটার ৩৫ হাজার ৯৬৯ জন।
এতে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের কর্ণফুলী উপজেলায় মোট ২৭৩টি ভোট কক্ষ রয়েছে। পাঁচ ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যা ১,৩৪,২৪৫, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭০,৮৯০ এবং মহিলা ভোটার ৬৩,৩৫৫।
আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার ভোট কেন্দ্রের তথ্য সম্বলিত সার সংক্ষেপে জানা গেছে, আনোয়ারায় ৭৪ টি স্থায়ী ভোট কেন্দ্র আর কর্ণফুলীতে ৪৪ টি মোট দুই উপজেলা মিলে ১১৮ টি ভোটকেন্দ্র। ভোট কক্ষের সংখ্যায় স্থায়ী কক্ষ আনোয়ারায় ৪৮৪টি, অস্থায়ী ভোট কক্ষ আনোয়ারায় ৩৩ টি, মোট কক্ষ ৫১৭টি, এতে আনোয়ারায় পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৮৩ টি, মহিলা ১ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ টি। মোট ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯০ ভোট।
এছাড়া কর্ণফুলী উপজেলায় ৫ ইউনিয়নে ভোট কেন্দ্র ৪৪ টি, স্থায়ী ভোট কক্ষের সংখ্যা ২৫৫ টি, অস্থায়ী ১৮ টি, মোট ২৭৩ টি ভোট কক্ষ। এতে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৯০ জন, আর মহিলা ৬৩ হাজার ৩৫৫ জন। মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৪৫ জন।
সে হিসেবে ২৯০ চট্টগ্রাম ১৩ আসনে মোট ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৮ টি, স্থায়ী ভোট কক্ষ ৭৩৯ টি, অস্থায়ী ভোট কক্ষ ৫১ টি, মোট ভোট কক্ষ ৭৯০ টি। পুরুষ ভোটার দুই উপজেলা (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) মিলে ২ লাখ ৪ হাজার ৮৭৩ জন ও মহিলা ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৬২ জন, কোন হিজড়া নেই। তাহলে সর্বমোট পুরুষ ও মহিলার ভোটার সংখ্যা দাঁড়াল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৩৫ জন।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) সংসদীয় আসনে পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়। চট্টগ্রাম উত্তর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ৩,২১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,৮৪১ জন এবং মহিলা ভোটার ৩৭০ জন।
নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, যেসব ভোটার নিজ নিজ ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে ভোট দিতে পারবেন না, তাঁদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর আওতায় পড়ছেন—নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, কারাগারে বা আইনগত হেফাজতে থাকা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক এবং নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কারণে নিজ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে অসমর্থ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। এসব ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কর্ণফুলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্র এবং আনোয়ারা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ভোটাররা নিরাপদ পরিবেশে নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না এবং কেন্দ্রভিত্তিক অনিয়মের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।