শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। শেখ মুজিব - এর দিকনির্দেশনা না থাকায় পাকবাহিনীর গণহত্যা ও প্রচন্ড নির্যাতনের মুখে জাতি যখন হতাশ ও বিভ্রান্ত, ঠিক তখনই আশার আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন সেদিনের মেজর জিয়াউর রহমান। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান যুদ্ধের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১-এর জুন পর্যন্ত ১নং সেক্টর কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সহ্য করতে না পেরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর স্বাধীনতা পদক ও বীর উত্তম উপাধি বাতিল করেছিলো। ইতিহাসের মহানায়ক কে ছোট করার নানা আয়োজন পলাতক হাসিনা গং করেছিলো কিন্তু সত্য চিরন্তন। মেজর জিয়াই মহান স্বাধীনতার ঘোষক। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য ইতিহাস বিকৃত করেছিলো খুনী হাসিনা।

মেজর জিয়া নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে আহবান জানিয়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার। তার সে ঘোষণা ও আহবান জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। হতাশা ও বিভ্রান্তি কাটিয়ে জাতি যুদ্ধে নেমে পড়েছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানকে কেউ খাটো করে দেখলে ভাবতে হবে সে একজন মুর্খ, সে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানেনা এবং যে জানে কিন্তু অস্বীকার করে সে একজন জ্ঞান পাপী এবং সে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই বিশ্বাস করে না। দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজী রেখে স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সেদিন জিয়ার অগ্রণী ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানকে স্বীকার না করা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জিয়াউর রহমানের অবদান অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, থাকবে। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে। তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠছিল বিস্ফোরণোন্মুখ। মেজর জিয়া নজর রাখছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আর সৈনিকদের ওপর। জিয়ার ওপরও পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা নজরদারি চালাচ্ছিল।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ চট্টগ্রামে বিহারিরা হামলা করে বাঙালিদের এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে। এরপর থেকেই চট্টগ্রামে ব্যাপক গোলযোগের সূচনা হয়। বাঙালি হত্যা ও বাঙালিদের দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মেজর শওকত, ক্যাপ্টেন শমসের মবিন চৌধুরী এবং মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী জিয়াকে জানান, জিয়া যদি অস্ত্র তুলে নেন তাহলে তারাও দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। তাদের কথা শুনে জিয়া উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে থাকেন।
৪ মার্চ, ১৯৭১ সাল। মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন অলি আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা সশস্ত্র সংগ্রামের সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে ধরে নেন। পরে তারা নিয়মিত মিলিত হয়ে নিজেদের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। এ লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণও করতে থাকেন। এভাবেই আসে ৭ মার্চ, ১৯৭১ সাল। এ দিন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণাকে গ্রিন সিগন্যাল ধরে নিয়ে জিয়া এবং তার সমমনারা সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৩ মার্চ ইয়াহিয়ার আলোচনা ব্যর্থ হলে জিয়া এবং সমমনারা নিজেদের প্রস্তুতিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান।
১৯৭১ সালের ১৭ মার্চে স্টেডিয়ামে লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী, মেজর জিয়া, ক্যাপ্টেন অলি, মেজর আমিন চৌধুরী গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। লে. কর্নেল এম আর চৌধুরীকে নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করা হয়। দুই দিন পর এম আর চৌধুরী ইপিআরকে সঙ্গে নেয়ার প্রস্তাব দেন। জিয়া এবং সমমনারা ইপিআর বাহিনীকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানান। ২১ মার্চ তারিখে জেনারেল হামিদ খান আসেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। চট্টগ্রামে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়নই তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল। ২৪ মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ঢাকা চলে আসেন।
২৫ ও ২৬ মার্চে মধ্যবর্তী কালো রাতের ১টার সময় মেজর জিয়ার কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়া জিয়াকে নির্দেশ দেন নৌবাহিনীর ট্রাকে করে চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়ে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে। জিয়ার পক্ষে তা মানা সম্ভব ছিল না। কারণ পরিস্থিতি দেখে জিয়ার মনে হচ্ছিল হয়তোবা জেনারেল আনসারী তাকে চিরকালের শেষ স্বাগত জানানোর জন্য চট্টগ্রামের বন্দরে প্রতীক্ষায় আছেন। তবু ধৈর্যচ্যুতি না ঘটিয়ে জিয়া বন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন৷ জিয়ার বাহিনী বন্দরের পথে বের হয়। আগ্রাবাদে তাদের থামতে হয়। পথে ছিল ব্যারিকেড। এই সময়ে সেখানে আসেন মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী। চৌধুরীর সঙ্গে জিয়ার কানে কানে কথাহয়। সেখানে
ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে বার্তা এসেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ও শহরে সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে। বহু বাঙালিকে তারা হত্যা করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের এই ধরনের ঘৃণ্য কর্মকা- জিয়াকে বিদ্রোহী করে তোলে। এটা ছিল একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত সময়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জিয়া বলেন, “উই রিভোল্ট। আমরা বিদ্রোহ করলাম। তুমি (মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরী) ষোলশহর বাজারে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেফতার কর। অলি আহমদকে বলো ব্যাটালিয়ন তৈরি রাখতে। আমি আসছি।'
ধীরস্থির চিত্তের অভিজ্ঞ সমরনায়ক জিয়া কথা শেষে নৌবাহিনীর ট্রাকের কাছে ফিরে যান। পাকিস্তানি অফিসার, নৌবাহিনীর চিফ পোস্ট অফিসার ও ড্রাইভারকে জিয়া কিছুই বুঝতে না দিয়ে জানান, তাদের আর বন্দরে যাওয়ার দরকার নেই। এতে তাদের মনে কোনো প্ৰতিক্ৰিয়া হলো না দেখে জিয়া তার পাঞ্জাবি ড্রাইভারকে ট্রাক ঘুরাতে বলেন। ভাগ্য ভালো, সে জিয়ার আদেশ মানে। ট্রাক ঘুরিয়ে তারা আবার চলতে থাকে। ষোলশহর বাজারে পৌছেই জিয়া গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে একটা রাইফেল তুলে নেন। পাকিস্তানি অফিসারটির দিকে তাক করে হাত তুলতে বললে তিনি জিয়ার কথা মানেন এবং অস্ত্র ফেলে দেন। জিয়া কমান্ডিং অফিসারের জিপ নিয়ে তার বাসায় যান। বাসার বেল টিপতেই কমান্ডিং অফিসার পাজামা পরেই বেরিয়ে আসেন। ক্ষিপ্র গতিতে জিয়া তার ঘরে ঢুকে পড়েন এবং গলাশুদ্ধ তার কলার টেনে ধরেন। দ্রুতগতিতে আবার দরজা খুলে জিয়া কমান্ডিং অফিসারকে বাইরে টেনে আনেন। বলেন, ‘বন্দরে পাঠিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিলে? এই আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। এখন লক্ষ্মী সোনার মতো আমার সঙ্গে এসো।' চালাক কমান্ডিং অফিসার (জানজুয়া) বিদ্রোহী জিয়ার কথা মানতে বাধ্য হন। জিয়া জানজুয়াকে ব্যাটালিয়নে নিয়ে আসেন।অফিসারদের মেসে যাওয়ার পথে জিয়া মেজর শওকতকে ডাকেন এবং তাকে জানান যে, তারা বিদ্রোহ করেছেন। শওকত এবং জিয়া হাতে হাত মিলান। জিয়া ব্যাটালিয়নে ফিরে দেখেন জিয়ার পূর্বের নির্দেশ মেনে ইতোমধ্যেই সব পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারকে বন্দী করে একটা ঘরে রাখা হয়েছে। জিয়া অফিসে গিয়ে চেষ্টা করেন লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী আর মেজর রফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারেন না। সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারপর রিং করেন বেসামরিক বিভাগের টেলিফোন অপারেটরকে। তাকে অনুরোধ জানান ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার, কমিশনার, ডিআইজি, আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তারা যুদ্ধ করবে। টেলিফোন অপারেটর জিয়ার অনুরোধ রক্ষা করেন। সময় ছিল অতি মূল্যবান। জিয়া ব্যাটালিয়নের অফিসার জেসিও আর জওয়ানদের ডাকেন। তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তারা সবই জানত। জিয়া সংক্ষেপে সব বলেন এবং তাদের নির্দেশ দেন সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে জিয়ার আদেশ মেনে নেন। জিয়া তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দেন।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান এক অবিস্মরণীয় নাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল ২৫ মার্চ রাতেই। আর ওই ২৫ মার্চ গত মধ্যরাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়া। তখন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি শুধু বিদ্রোহ ঘোষণাই করেননি, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘোষণাটিও দিয়েছিলেন তিনি । সেদিন সমগ্ৰ বাঙালি জাতি ছিল দিশেহারা, দিকনির্দেশনাহীন। ঠিক এ সময়ে মেজর জিয়ার প্রত্যয়দীপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠের ঘোষণা দেশবাসী সুস্পষ্টভাবে শুনেছেন। এ ঘোষণায় তাদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, আশার সঞ্চার হয়েছে, চিত্ত শিহরিত হয়েছে এবং জাতি স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুপ্রাণিত হয়েছে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসা কণ্ঠটি ছিল—আমি মেজর জিয়া বলছি...। এ সম্পর্কে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার বলেন, ‘জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে যে একটা প্রচণ্ড উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়, সে সম্পর্কে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়।' পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং বেতারে স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার পর বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে মেজর জিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
এ ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ভারতের ‘দি স্টেটসম্যান' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের দলিলেও এটি রয়েছে। সে ঘোষণাটি ছিল, “আমি মেজর জিয়া বাংলাদেশ মুক্তিফৌজের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান সেনাপতি হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আরও ঘোষণা করছি যে, আমরা ইতোমধ্যে একটি স্বাধীন বৈধ সরকার গঠন করেছি। এই সরকার আইনগতভাবে এবং সংবিধান অনুসারে পরিচালিত হবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ সরকার সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রয়াসী এবং আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য কাজ করে যাবে। আমি বাংলাদেশে পরিচালিত বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশে জনমত সংগঠিত করার জন্য সবার প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম বৈধ সরকার এবং এ সরকার বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।' মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে খন্দকার, মঈদুল হাসান ও এস আর মির্জার কথোপকথন নিয়ে প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত 'মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন' শীর্ষক বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক তথ্যটি স্থান পেয়েছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ কে খন্দকার ছিলেন মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি, সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এবং সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতি। মঈদুল হাসান ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও মূলধারা '৭১ গ্রন্থের লেখক এবং এস আর মির্জা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গঠিত যুবশিবিরের মহাপরিচালক। তিন বীর মুক্তিযোদ্ধার কথোপকথনে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টিও বিস্তারিতভাবে স্হান পেয়েছে। মেজর জিয়ার এ ঘোষণাটি সারাদেশের ভেতরে এবং সীমান্তে যত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল—হ্যাঁ, এবার বাংলাদেশ একটা যুদ্ধে নামলো।
জিয়াউর রহমান এবং তাঁর বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁরা বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। জিয়াউর রহমান এবং তাঁর বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁরা বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর
অভিযানের মুখে কৌশলগতভাবে তাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করেন। একাত্তরের রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমানের বীরত্বগাথা লিখে শেষ করা যাবে না। তিনিই প্রথম ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে 'বিদ্রোহ' ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত করেন। তিনিই চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ৩০ মার্চ জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দেন। রণাঙ্গনে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সবসময় সামনে থাকতেন এবং কমান্ডারদের সৈনিকের সামনে থাকতে পরামর্শ দিতেন।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের দু'দিন আগে সিলেটের এমসি কলেজের পাশ দিয়ে সিলেট শহরে ঢোকার আগে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাপক গোলাবর্ষণের শিকার হয়েছিলেন জিয়ার বাহিনী। এ পরিস্থিতিতে সহকর্মীরা তাকে পিছিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সবাই মরে গেলেও সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন ।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, বিশেষ করে রণক্ষেত্রে তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। রণক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের অভিজ্ঞতা অনেক আগের। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি অসাধারণ রণনৈপুণ্য দেখিয়ে সবার দৃষ্টি কাড়েন তখন। তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন অফিসার হিসেবে ওই যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি নৈপুণ্য দেখিয়েছিল প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। ১৯৭১ সালের আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে তিনি অসীম সাহস এবং বীরত্ব দেখান। তিনিই প্রথম পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি যখন বিদ্রোহ ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করলেন, তখন তিনি দেখলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যসংখ্যা মাত্র ৩শ'। তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক ছিলেন। মাত্র সাতজন অফিসার এবং ৩শ' সৈন্য নিয়ে ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য এবং অপ্রতুল অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনি প্রথমে তার বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এই বিদ্রোহ ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ, যা জিয়াউর রহমানের মতো নায়কের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
বাংলাদেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে জিয়া ইতিহাসে নিজের অক্ষয় স্থান নিশ্চিত করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, সময়োপযোগী গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ এসব বহুমাত্রিক সাফল্যের কথা সুবিদিত এবং বহুল চর্চিত। শহীদ জিয়া ছিলেন মাটি ও মানুষের নেতা। এ দেশের গরিব মেহনতি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ছিল তার অন্যতম জীবন সাধনা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তি ও মহান রাষ্ট্রনায়ক। জিয়া বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। জাতীয় ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে একজন পরিত্রাণকারী হিসেবে রাজনীতিতে জিয়ার আবির্ভাব। তিনি শতধা বিভক্ত জাতিকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করেছেন। জিয়া দেশপ্রেমে উজ্জ্বল এক অনুভূতির নাম। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ, জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ’- ছিল জিয়ার বিশ্বাস ও ধ্যান। তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শুধু রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেননি, স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অবদান রেখে গেছেন। ইতিহাস থেকে কারো অবদান জোর করে মুছে দেয়া যায় না। সাময়িকভাবে জিয়াকে হেয় করা, তার সোনালি অবদানকে অস্বীকার করার অপতৎপরতা আমরা পলাতক হাসিনা রেজিমে দেখছি। কিন্তু এ অপপ্রয়াস সফল হই নি। জিয়াকে ভুলিয়ে দেয়া, তার অবদানকে মুছে ফেলার সাধ্য এ দেশে কারো হবে না। জিয়া থাকবেন দেশপ্রেমিক বিবেকবান প্রতিটি মানুষের অন্তরে এক জীবন্ত প্রত্যয় হিসেবে। আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের ৫৪ বছরে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম কে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক,
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা।
বি.এস.সি ইন ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং,
এল.এল.বি
মোবাইল: ০১৮১৯৬১৭৩৮০
Email : [email protected]